সর্বশেষ খবর

   বানিয়াচংয়ে মাড়াইয়ের মেশিনের আঘাতে কৃষকের মৃত্যু    বালাগঞ্জে ছুরিকাঘাতে যুবক খুন    স্বাভাবিক জীবনে ফিরল সুন্দরবনের ৫৭ দস্যু    শুক্রবার কলকাতা যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী    মাদকবিরোধী অভিযানে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ৭ জন নিহত    নবীগঞ্জ পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত মেয়র হলেন এটিএম সালাম    ঈদে ৪ দিন সিএনজি স্টেশন ২৪ ঘণ্টা খোলা    সারা দেশে বন্দুকযুদ্ধ : মানবাধিকার কমিশনের উদ্বেগ    শিল্প প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে দেশি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে: রাষ্ট্রপতি    ছিটকে পড়লেন রোমেরো    বিরল রোগ আক্রান্ত মুক্তামনি আর নেই    বালাগঞ্জে ভেজাল বিরোধী অভিযান    র‍্যাবের খাঁচায় সিলেটের ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ সুধাংশু    বিশ্ব মেট্রোলজি দিবস উপলক্ষে সিলেটে আলোচনা সভা    জিন্দাবাজারে রিফাত এন্ড কোং’এ ২০ হাজার টাকা জরিমানা    মৌলভীবাজারে দুই ছাত্রলীগ কর্মী খুনের মামলার প্রধান আসামির আত্মসমর্পণ    সহকর্মীকে ‘হ্যান্ডসাম’ বলায় চাকরি হারালেন সংবাদ উপস্থাপিকা    প্রতিটি পোস্টে নজর রাখছে ১৫ হাজার ‘ফেসবুক পুলিশ’    মন্ত্রী-সচিবদের কেউ কেউ ফোন-ফ্যাক্সের দোকান খুলে বসতে পারেন: পার্থ    মিশিগান বিএনপির উদ্যোগে ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত


পর্যটন

চীনে রসনা বিলাস|শান্তা মারিয়া

সিলেট বার্তা, ২০১৬-০৮-২৯ ২২:১৫:৪২

চীনে যাওয়ার আগেই মানুষজন আমাকে ভয় দেখানো শুরু করেছিল, খাবার মুখে দিতে পারবেন না বলে। এক আত্মীয়া তো যাওয়ার আগের দিন বাড়ি বয়ে এসে বলে গেলেন, আমি নাকি ওখানে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ব। তিনি আর তার ছেলে চীনে গিয়ে সাতদিন কিছু খেতে পারেননি ইত্যাদি, ইত্যাদি। সহকর্মীরা ঠাট্টা করলেন যে চীনারা সাপ, ব্যাঙ খায়, আমাকেও নাকি তাই খেয়ে থাকতে হবে।

আমি অবশ্য ভয় পাইনি। কারণ সব পরিবেশে টিকে থাকার মতো মনের জোর আমার আছে। যাই হোক চীনে এসে দেখলাম যত শুনেছিলাম তত নয়। চীনে যথেষ্ট সুস্বাদু খাবার আছে। আমাদের খাদ্য রুচির সঙ্গে ওদের একটু গরমিল আছে তবে সেটা তো হয়েই থাকে। যেমন শ্রীলংকা গিয়েও তো দেখেছিলাম তরকারিতে নারিকেলের গন্ধ।

চীনের সুস্বাদু খাবারের মধ্যে বিখ্যাত হলো রোস্টডাক, হটপট ইত্যাদি। রোস্ট ডাকের চীনা নাম ‘খাওয়াইয়া’। কয়েক ধরনের রোস্টডাক আছে। তারমধ্যে আমি যে রকম খেয়েছিলাম সেটা হলো, পাতলা করে কাটা সেদ্ধ হাঁসের মাংসের ফালি। সেটা খুব পাতলা হাত রুটির মধ্যে নিয়ে পেঁচিয়ে নিতে হয়। সঙ্গে বিভিন্ন রকম চাটনি থাকে সেটা দিয়ে খেতে হয়। বেশ ভালো স্বাদ। আরেকটি সুস্বাদু খাবার হলো হটপট। হটপট পরিবেশনেরও বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। বড় রেস্টুরেন্টে হটপটের টেবিল আলাদা। সেখানে টেবিলের মধ্যে চার কোনা দুটি ডিশ বসানো থাকে। টেবিলের নিচে চুলা বসানো রয়েছে। ডিশে ফুটন্ত পানি রয়েছে। সেটা মসলা দেওয়া। পাতলা ফালি করে কাটা মাংস, সবজি, নুডলস ইত্যাদি থাকবে টেবিলে। নিজের খুসি মতো খাবার ওই ফুটন্ত  মসলা দেওয়া ডিশে ফেলতে হবে। একটু সিদ্ধ হলে সেটি চপস্টিক দিয়ে তুলে খেতে হবে। সঙ্গে নেওয়া চলবে বিভিন্ন স্বাদের সস।

ছোট ছোট রেস্টুরেন্টে হটপট পরিবেশনের জন্য ছোট ছোট পাত্র রয়েছে। এই পাত্রের নিচেই আগুন জ্বলতে থাকে। পদ্ধতি একই। পাত্রে থাকে মসলা দেওয়া পানি। সেই ফুটন্ত পানিতে খাবারগুলো ফেলে সিদ্ধ করে নিতে হয়। চীন বেতারে আমার সহকর্মী ইয়াও ওয়েমিং বললেন হটপট প্রথম নাকি আবিষ্কার করেছিলেন চেঙ্গিজ খানের বাবুর্চি। মঙ্গোলিয়ার স্তেপে দারুণ ঠাণ্ডা। খান-ই-খানানের তাবুতে খাবার নিয়ে যেতে যেতেই সব ঠাণ্ডা হয়ে যেত। চেঙ্গিস খান বাবুর্চিকে হুমকি দিয়েছিলেন যে, খাবার ঠাণ্ডা হলে মাথা কাটা যাবে। প্রাণের দায়ে আবিষ্কৃত হয় হটপট-গরম গরম খাবার দেওয়ার এই পদ্ধতি। আমাকে আর সহকর্মী শিহাবকে সুন্দর একটি রেস্টুরেন্টে হটপটের দাওয়াত দিলেন ইয়াও ওয়েমিং। হাতে কলমে শিখিয়েও দিলেন কিভাবে খেতে হয়।

ইয়াও ওয়েমিং আমাকে আর শিহাবকে আরেক দিন নিয়ে গেলেন এক অন্যরকম খাবার খাওয়াতে। বেইজিংয়ের বাণিজ্যিক এলাকা শিদানে বিশাল এক শপিং কমপ্লেক্স। নাম তার জয় সিটি। তার ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায় শুধু ফুডকোর্ট। সেখানে এক রেস্টুরেন্টে গেলাম। সঙ্গে কলকাতা থেকে আসা শ্রাবস্তী বসু নামে এক লেখক। চীনারা ব আর প প্রায় একইভাবে উচ্চারণ করে। শ্রাবস্তীদি নিজের নাম নিয়ে নিজেই ঠাট্টা করে বললেন যে, ‘বসু’ যদি ‘পশু’ হয়ে যায় তাহলেই সর্বনাশ। যাই হোক আমরা গেলাম জয় সিটিতে।

কাউন্টারে দেখলাম, কাটাসবজি, চিংড়িমাছ, মাংস, বিনকার্ডসহ নানা রকম বস্তু রাখা আছে। সেখান থেকে পছন্দমতো বেছে নিতে হবে একটি বৃহৎ পাত্রে। বলে দিতে হবে ঝালের মাত্রা কিরকম হবে সেটাও। তারপর ওয়েটার সেটা নিয়ে যাবেন কিচেনে। চটজলদি তামসলা দেওয়া পানিতে সেদ্ধ করে নিয়ে আসবেন।

কি যে মজার স্বাদ সেই খাবারে। পরে বেশ কয়েকবার সেই রেস্টুরেন্টে গিয়ে সেই বিশেষ খাবারটি খেয়েছি।

চীনে দশটি রেস্টুরেন্ট পাশাপাশি থাকলে তার মধ্যে একটি মুসলিম রেস্টুরেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। মুসলিম রেস্টুরেন্টের সাইনবোর্ডে আরবিতে বিসমিল্লাহ লেখা থাকে। মুসলিম রেস্টুরেন্টে নিশ্চিন্ত মনে খাওয়া চলে। কারণ এখানে কোনোভাবেই শুকর বিক্রি হয় না।

আমি থাকতাম বেইজিংয়ের শিজিংশান এলাকায় চীন বেতারের মিডিয়া কমপ্লেক্সে। সেখান থেকে খুব কাছে রেস্টুরেন্ট পাড়া। এখানে মুসলিম রেস্টুরেন্টে আমি আর শিহাব সপ্তাহে অন্তত একদিন খেতাম। এখানে পাওয়া যায় শিক কাবাব। ইয়াংরো ছুয়ান মানে ছাগলের মাংসের কাবাব। দারুণ সুস্বাদু, সঙ্গে মসলা দেওয়া রুটি। ছাও ফেন বা ফ্রাইড রাইস পাওয়া যায়। আর পাওয়া যায় ডিপ ফ্রাইড বিন বা বরবটি ভাজা। চিংড়ি মাছ ব্রেড ক্র্যাম্প দিয়ে বা এমনি ভেজে দেওয়া হয়। বলাবাহুল্য এটি খুবই সুস্বাদু খাবার। মাছের অনেক রকম ডিশ পাওয়া যায়। ব্রাউন সসে ডোবানো এক ধরনের ডিশের নাম হোংশাওইয়ুয়ে। মাছের এই ডিশটি নাকি চেয়ারম্যান মাও সে তুংয়ের খুব প্রিয় ছিল।

সবজির কাবাব খুব মজার ডিশ। বেগুন, ক্যাপসিকাম, টমাটো ও বিভিন্ন রকমের সবজি শিকে গেঁথে কাবাব বানানো হয়। উপরে ছিটিয়ে দেওয়া হয় জিরা ও মরিচের গুঁড়ো।

সুপ নুডুলস পাওয়া যায় অনেক রকমের। আর ছাও ফেন বা ফ্রাইড রাইস তো আছেই। চীনে মিষ্টি আলু সেদ্ধ বা পোড়া এবং ভুট্টা সেদ্ধ খুব জনপ্রিয় খাবার। সহকর্মী শিহাব প্রায়ই বলতেন, চীনারা এত কিছু শিখল, এত ধনী হল কিন্তু পোড়া আলু খাওয়ার গরিবী অভ্যাস ছাড়তে পারল না।

 বেইজিংয়ের রাস্তার ধারে দেদারসে বিক্রি হয় মিষ্টি আলু পোড়া এবং ভুট্টা সেদ্ধ। এগুলো দামে বেশ সস্তা। আরেকটি মজার খাবার পাওয়া যায় বিভিন্ন মেলায় সেটা হলো আলু ভাজা। কাঠিতে গাঁথা হয় পাতলা করে কাটা আলু। পুরো আলু প্যাঁচিয়ে কেটে কাঠিতে গেঁথে দেওয়া হয়। কাঠিসহ ডুবো তেলে ভেজে সস, লবণ ও মরিচ ছিটিয়ে দেওয়া হয়। ভীষণ মজা খেতে।


চীনারা শুকরের মাংস খেতে খুব ভালোবাসে। প্রায় সব খাবারেই শুকরের মাংস দিতে চায়। এ জন্য আগেই জিজ্ঞাসা করে নিতাম, “চুরোইয়াওমা?” মানে “এর মধ্যে শুকরের মাংস আছে কি?” যদি বলে “মেইইয়াও” মানে নেই। তবেই সেটি খেতাম। চীনে ফ্রাইড রাইস বা অন্য কোনো খাবারে যদি দেখেন গাজরের কুচি দেওয়া আছে তাহলে বুঝবেন সেটি গাজরের কুচি নয় শুকরের মাংসের কুচি। এই কুচি থাকতে পারে সালাদে, সুপে, নুডলসে। তবে চীনে আসল মজা হলো ফল খেয়ে। কত রকমের ফল যে পাওয়া যায় এখানে। আম পাওয়া যায় ছোট্ট ছোট্ট। ভীষণ মিষ্টি। লিচু, আঙুর, চেরি, স্ট্রবেরি, আনারস, আপেল, তরমুজ, ড্রাগন ফ্রুট, নানা রকম কুল আর বেরি মেলে দেদার।

চীনারা বিভিন্ন রকম মদ খেতে ভালোবাসে। গ্রেট ওয়াল, পাইচু, রাইস ওয়াইন খায়। আর আন্তজার্তিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ তো আছেই। বিয়ারও খুব সস্তা এখানে। চীনা মেয়েরা ‘র শুয়ে’ বা গরম পানি খুব খায়। এক সময় আমারও অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল গরম পানি খাওয়া। তবে বলা বাহুল্য চীনের সব চেয়ে বিখ্যাত পানীয় হলো চা। এরা বলে ছা।

কত কিছু দিয়ে যে চা বানায় এরা। জেসমিন বা বেলী ফুল শুকিয়ে তৈরি হয় বিখ্যাত জেসমিন টি। আরও আছে গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা ইত্যাদি ফুলের চা। চা-পাতা দিয়ে যে চা হয় সেটিও আমাদের মতো নয়। শুকনো চা-পাতা ফুটন্ত গরম পানিতে ফেলে দিলে দেখা যায় পুরো পাতা মেলে দিয়েছে। সেই পাতা ভেজানো পানি খাওয়া হয় কাপের পর কাপ।

কারও বাড়িতে বা অফিসে গেলে পরিবেশন করা হয় চা। কাপ খালি হলেই আবার ভরে দেওয়ার নিয়ম। কারণ খালি কাপ মানে অকল্যাণ। তাই কয়েক কাপ পান করে আর চা খাবার ইচ্ছে না থাকলে কাপ ভরা অবস্থাতেই রেখে দিতে হয়।

এখানে বিভিন্ন টিহাউজ আছে। সেগুলোতে চা পরিবেশনের পাশাপাশি নৃত্যগীত প্রদর্শনের ব্যবস্থা আছে। বিখ্যাত বেইজিং অপেরা পরিবেশন করা হয় লাওশে টি হাউজে।

চীনে চিয়াওজা বা ডাম্পলিং বিখ্যাত। এগুলো নানা স্বাদের হয়। খেতে হয় সেদ্ধ রসুন দিয়ে বা কোনো সস দিয়ে। দারুণ স্বাদের খাবার। চীনা খাবার খেতে পারবো না বলে যারা ভয় দেখিয়েছিলেন তাদের ডেকে বলতে ইচ্ছা করে, চীনে খাওয়া নানা রকম সুস্বাদু খাবারের স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে।

শেয়ার করুন

Print Friendly and PDF

আপনার মতামত দিন